মহাপৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন কবি শম্ভু রক্ষিত, শোকাহত দুই মেদিনীপুর সহ বাংলার সাহিত্য জগৎ

308 Views
ফাইল চিত্র

অরুন কুমার সাউ, তমলুক: যে কবি নিজের কবিতায় লিখেছিলেন- ‘আমি পৃথিবীর কত বাইরে, কত উপরে আছি!’ সবার প্রিয় সেই মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিত চলে গেলেন না ফেরার দেশে । আজ 29 শে মে, শুক্রবার নিঃশব্দে তিনি আমাদের ছেড়ে এই পৃথিবীর বাইরে অনেক উপরে চলে গেলেন। কবি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। আজ সকাল আটটায নিজের বাসগৃহে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । কবি কে হারিয়ে দুই মেদিনীপুর তথা বাংলার সাহিত্য জগৎ শোকাহত।

নাগরিক অন্তঃসারশূন্য মেকী উজ্জ্বলতা ও প্রচারসর্বস্ব অশ্লীলতার যাবতীয় তমসা থেকে কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে বসে থেকে যিনি অকুতোভয়ে উচ্চারণ করেন,”আমরা সকলেই পরীক্ষা দিতে বসেছি, খাতা জমা রেখে যেতে হবে, মহাকাল কাকে কত নম্বর দেবে তার ওপরেই নির্ভর করছে কবি ও কবিতার ভবিষ্যত, খাতা জমা দিয়ে চলে যাবো, চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর খাতাগুলো দেখা হবে, যদি কিছু সারবস্তু থাকে, পাশ করবেন, নাহলে গোল্লা!!” সেই কবি শম্ভু রক্ষিতের পিতৃপুরুষের ভিটে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সুতাহাটা থানার বিরিঞ্চিবেড়িয়া গ্রামে। জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৬ই আগস্ট হাওড়ার ১১, ঠাকুরদাস দত্ত বাই লেনে মাতুলালয়ে। পিতা নন্দলাল রক্ষিত ছিলেন ব্যবসায়ী, হাওড়ার দাশনগরে তাঁর একটি লোহার সিন্দুকের কারখানা ছিলো। মা রাধারানী দেবী ছিলেন গৃহবধূ। কবির প্রাথমিক শিক্ষা সুতাহাটার পূর্ব শ্রীকৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বৃত্তি পরীক্ষা পাশ করে হাওড়ার কদমতলায় চলে আসার পর মাধ্যমিক স্কুল জীবন শুরু হয় ব্যাঁটরা মধুসূদন পালচৌধুরী স্কুলে। তিনি পরবর্তীতে নরসিংহ দত্ত কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলেও প্রথাগত শিক্ষার প্রতি প্রভূত অনাগ্রহের কারণে তা সম্পূর্ণ করেন নি।

বিশুদ্ধ কবির জীবনকে তার কবিতা থেকে পৃথক করে দেখা পাপাচারেরই নামান্তর হয়। হাংরি আন্দোলন নিয়ে কবির তুমুল আগ্রহের ফলশ্রুতি ছিলো নিজস্ব সম্পাদনা ও প্রকাশনায় হাওড়ার বাড়ি থেকে প্রচারিত হওয়া “ব্লুজ” পত্রিকা। অক্ষয়কুমার রমনলাল দেশাই সম্পাদিত “Violation Of Democratic Rites”-এর তৃতীয় খন্ডে উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৯৭৬ সালে পুলিশ শম্ভু রক্ষিতের উপর হাজতে অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিলো আর তারপর বিনা বিচারে তাঁকে আট মাস আটক রাখা হয়েছিলো। ১৯৬৪ সালে শুরু হওয়া মামলার জেরে “ব্লুজ” পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। হাংরি জেনারেশনের রূপকার মলয় রায়চৌধুরী শম্ভু রক্ষিতকে “সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত কবি” স্বীকৃতি দিয়ে লিখেছেন-.. … ” শম্ভুর একটি লেখা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কেমন করে গজিয়ে ওঠে তা এক রহস্য।কবিতা বিশেষটি আরম্ভ করে শম্ভু ক্রমশঃ ভঙ্গুর ডিকশানের মাধ্যমে তার গঠনবিন্যাসের ল্যাবিরিন্থে নিয়ে যান, ছবি পুরো গড়ে ওঠার আগেই অন্য ছবিতে চলে যান। ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই দশকের কবিতার যে ধারা তার সঙ্গে শম্ভুর কবিতার মিল নেই। তিনি নিজের বাক্য সাজানোর কৌশল গড়ে ফেলেছেন এবং তা থেকে কখনও সরে যাননি। আশে পাশে নানারকম আন্দোলন ও শৈলী নিরীক্ষা সত্বেও”।

যিনি দারিদ্র্যের কষ্ট নিয়েও সারা জীবন কেবল কবিতায় লিখে গেলেন। শুধু তাই নয় কবিতা লেখার জন্য কবি শম্ভু রক্ষিত সয়েছেন পুলিশের অকথ্য অত্যাচার। তবুও ভালোবেসেছেন কবিতাকেই সারাজীবন। কারণ তিনি বলতেন কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছুই তিনি পারেন না। কবি আরো বলতেন “কবিতা ছাড়া অন্য কোনও পবিত্রতায় আমার বিশ্বাস নেই”।

মাত্র তেইশ বছর বয়সে “তুমি কণিকা ও সূর্যের মধ্যে বিন্দু ও বিস্ফোরণজাত গোলাপ” -এর মতো লাইন সংবলিত শম্ভু রক্ষিতের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’ (১৯৭১) তে আমরা অসম্ভব দার্শনিক প্রৌঢ়তার আভাস পাই “তোমার নিঃসঙ্গতা আমায় উপহার দেয় দীর্ঘ আনন্দময় সমাধি’।

কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হল,’সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ’, ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’, ‘রাজনীতি’, ‘পাঠক,অক্ষরগুলি’, ‘সঙ্গহীন যাত্রা’, ‘আমার বংশধররা’, ‘আমি কেরর না অসুর’, ‘ঝাড় বেলুনের জোট’। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁর গল্প সঙ্কলন ‘শুকনো রোদ কিংবা তপ্তদিন অথবা নীরস আকাশ প্রভৃতি’ এবং একমাত্র উপন্যাস ‘অস্ত্র নিরস্ত্র’ (১৯৮০)। তিনি আমেরিকা নিবাসী বাংলাদেশের সাহিত্যানুরাগীদের দেওয়া ‘শব্দগুচ্ছ’ পুরস্কার প্রাপ্ত। তাঁর কবিতা ইংরেজি ও হিন্দিতে অনূদিত হয়েছে। সাহিত্যিক শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন “সত্তরের আধুনিক কবিদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিমান ও সম্ভাবনাময় কবি শম্ভু রক্ষিত”। শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন “তার কবিতা সমকালের পাঠকরা সেভাবে অনুধাবন করতে না পারলেও আগামী দিনের পাঠকরা সঠিক মূল্যায়ন করবে।” এই কবি নিজে প্রুফ দেখা থেকে শুরু করে ছাপা অবধি “মহাপৃথিবী” নামের ব্যতিক্রমী কবিতা পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। তাঁর সম্পাদিত মহাপৃথিবী পত্রিকার 50 বছরে পা দেওয়াকে স্মরণীয় করে রাখতে সুতাহাটা বিরিঞ্চি বেড়িয়া বাড়িতে এ বছরই লকডাউন এর কিছুদিন আগেই বসেছিল মহাপৃথিবীর 50 বছর পূর্তি উৎসব । সেদিনের সাহিত্য অনুষ্ঠান বাংলার সাহিত্য জগতের ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

কবি, সাংবাদিক সুজিত ভৌমিক শোক প্রকাশ করে বলেন , “সাহিত্যের বড় ক্ষতি হয়ে গেলো। এতো বড় মানুষ। কিন্তু কোনো অহংকার ছিলো না। আমাদের ‘সকলের কথা সৃজন সম্মান’ অনুষ্ঠানে সাহিত্য সম্মান প্রদান করেছি ওনাকে। আমরা গর্বিত, তাঁর মতো মানুষকে সম্মান জানাতে পেরেছি। যে মঞ্চে শম্ভু রক্ষিতকে আমরা সংবর্ধিত করেছিলাম, সেই মঞ্চে সেদিন উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক শংকরলাল ভট্টাচার্য। তিনি সেদিন শম্ভুবাবুকে দেখে আনন্দে বিগলিত হয়ে উঠেছিলেন। বলেছিলেন – শম্ভু বাবু হলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রিয় কবি। যিনি শম্ভু রক্ষিতের কবিতা নিয়মিত পড়তেন। পড়তে ভীষণ ভালোবাসতেন। প্রয়াত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মুখ থেকেই তিনি একথা শুনেছিলেন বলে সেদিনের সংবর্ধনা মঞ্চে শংকরলাল বাবু বলেছিলেন। কয়েক মাস আগেই শম্ভুদার বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেদিন শম্ভুদাকে নিয়ে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো। আমাকে বক্তব্য রাখতে বলা হলে আমি শংকরলাল ভট্টাচার্যের কথাই বলেছিলাম।” কবি দেবাশিস মুখোপাধ্যায় স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি কবিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম কফি হাউস এ শনিবার যাওয়াতে। পরে প্রতি বইমেলায় মহাপৃথিবী সংগ্রহ করেছিলাম। হলদিয়াতে মুখোমুখি অনেক কথা হয়েছে। ব্যতিক্রমী লেখার ভক্ত ছিলেন। নিজেও তাই লিখতেন। তার চলে যাওয়া একটি বিশেষ যুগের অবসান। তবে বাংলা কবিতায় তাঁর স্থান চিরস্থায়ী।”

কবি শুভঙ্কর দাস স্মৃতিচারণ করে বলেন, “কবি শম্ভু রক্ষিত পৃথিবীর মধ্যে নতুন এক পৃথিবীর সন্ধানী ছিলেন।তিনি আপাত দুর্বোধ্যতার আড়ালে অযুত আলোর দরজা নির্মাণ করে গেছেন কবিতায়।তাঁর কবিতা তাই হাজারদুয়ারী।বাংলা কাব্যে তিনি অনন্য এবং অনুভবে আলাদা আকাশ। আমি তাঁকে কবিতাজীবনে একাধিক বার সাক্ষাৎ করি।সভাতে এবং কলকাতা বইমেলায়। সর্বদা কবিতার জন্য একটা নিবেদিত মানুষ মনে হত তাঁকে।তিনি ছিলেন জীবন্ত কবিতার বই।” কবি , গল্পকার সৌরভ কুমার ভূঁইয়া বলেন, করোনার তাণ্ডবে পৃথিবীর টলোমলো অবস্থা। বিশ্ব মহামারীতে বিপর্যস্ত গোটা বিশ্ব। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমপানের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড অবস্থা আমাদের রাজ্যের। এককথায় সময়টা একদমই ভালো যাচ্ছে না।এই সংকটময় সময়ে আমরা একে একে হারিয়েছি অনেক প্রিয় মানুষকে।সেই হারানোর পথ ধরে পৃথিবী থেকে না মহাপৃথিবীর পথে চলে গেলেন মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিত। কবিতাই তাঁর সব। কবিতার মধ্যেই তিনি পেয়েছেন পবিত্র বিশ্বাস। কবিতা লেখার জন্যই তাঁর জন্ম। সেই কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।” কবি গৌরাঙ্গ মোহন পাল স্মৃতিচারণা করে বলেন, “আমাদের অগ্রজ অনুপ্রেরণার ভালোবাসার মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিত আজ সকালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে যখন কথাটা শুনলাম মনটা ভীষণভাবে খারাপ হয়ে গেলো। আমরা একটা ছাদ হারালাম। এটুকুই বলব আর কি বলব আমি ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা। এই করোনা আবহে আমরা সবাই বন্দী। আমরা শেষ দেখাটা দেখতে পেলাম না। দেখতে যেতে পারছিনা এটা যে কতটা কষ্টের সেটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।”

তথ্য ও চিত্র সহায়তায় কবি দেবাশিস মুখোপাধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!